• +8801742069354
  • environmenttalkbd@gmail.com
জলবায়ু সংকট ও এশিয়া পর্ব- ০১

পৃথিবীর পরিবেশ খুব দ্রুত পরিবর্তিত হচ্ছে। এক গবেষণায় দেখা গিয়েছে, বর্তমানে পৃথিবীর বসবাস যোগ্য অংশের এক-চতুর্থাংশ ভূমি ক্ষয় হয়ে গেছে। এর সাথে পাল্লা দিয়ে পাল্টে যাচ্ছে পৃথিবীর হাওয়া বাতাস। এটা পৃথিবীর জন্য অত্যন্ত দুঃখজনক ব্যাপার। আগামী প্রজন্মের জন্য সুস্থ পৃথিবী রেখে যাওয়া বর্তমান সময়ের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। “পৃথিবীর বাসযোগ্যতা ক্রমক্ষয়মান” - এটা এখন কোন বিতর্কের বিষয় নয় বরং প্রতিষ্ঠিত সত্য। ফলে পরিবেশ রক্ষায় আন্তর্জাতিক মহলে যথা সমেত হৈচৈ শোনা যায়। কিন্তু এখনও উন্নয়ন ও পরিবেশ রক্ষার পরিকল্পনাকে অনেক গুরুত্বপূর্ণ রাষ্ট্র বিপরীত মুখী ধারণা মনে করে যার ফলে গৃহীত পদক্ষেপ বাস্তবায়নে বেশ কাঠখড় পোড়াতে হচ্ছে। তবে বাস্তবতা হল, বিগত চার দশক আগের চেয়ে বর্তমান অবস্থা কিছুটা আশার সঞ্চার ঘটায়। কানাডা, নিউজিল্যান্ডসহ অনেক দেশই কার্বন ব্যবহার কমাতে ইতোমধ্যেই পদক্ষেপ নেওয়া শুরু করেছে।

 

পৃথিবীর বাস্তুতন্ত্র সুস্থ রাখতে অনবায়নযোগ্য উৎসের আহরণ কমাতে উদ্যোগী হওয়া জরুরী। এক সমীক্ষায়  দেখা গিয়েছে, পৃথিবীর বাস্তুতন্ত্র ঠিক রাখতে খনিতে সঞ্চিত ৮০% কয়লা, ৫০% গ্যাস এবং ৩৩% জ্বালানি তেল অব্যবহৃত অবস্থায় রাখতে হবে। এর বিকল্প জ্বালানি উৎপাদনে মনোযোগী হতে হবে। এর ব্যতিক্রম হলে পৃথিবীর অনিবার্য বিপর্যয় কাটানো প্রায় অসম্ভব হয়ে দাঁড়াবে। আন্তজার্তিক সংস্থা বা প্রভাবশালী দেশগুলোর সদিচ্ছা ছাড়া এই টার্গেট অর্জন করা সম্ভব নয়। তবে  প্রাতিষ্ঠানিক উদ্যোগের পাশাপাশি আঞ্চলিক ও ব্যক্তিগত উদ্যোগ পৃথিবীর অবক্ষয় কাটাতে আবশ্যক। সাম্প্রতিক সময়ে বেশ কিছু দেশ নবায়নযোগ্য জ্বালানি ব্যবহারে মনোযোগী হয়ে উঠেছে। বাংলাদেশের পরিকল্পনা কমিশন ইতোমধ্যে বাতাসকে ব্যবহার করে বিদ্যুৎ উৎপাদনের বিষয়টি নিয়ে প্রকল্প গ্রহণ করেছে। গত কপ-২৬ সম্মেলনে জাপান আগামী ২০৪০-৫০ সালের মধ্যে “জিরো কার্বন এমিশনের” প্রতিশ্রুতি ব্যক্ত করেছে। কিন্তু অধিকাংশ দেশই এই ধরনের কোন পরিকল্পনার ব্যাপারে কোন দৃশ্যমান কাজ করছে না এবং এই ব্যাপারে তাদের কোন কমিটমেন্টও নেই। এই অবস্থার দ্রুত উন্নত না হলে এবং নবায়নযোগ্য জ্বালানি ব্যবহারে অংশীদারত্বের প্রতিশ্রুতি না থাকলে আগামী পঞ্চাশ বছরে পৃথিবী একটা ম্যাসিভ সমস্যার সম্মুখীন হবে।

 

গত ২০১৬ সালের গোড়ার দিকে প্যারিস জলবায়ু চুক্তি এই শতাব্দীর একটা বড় আশার সঞ্চার ঘটায়। ভূপৃষ্ঠের গড় তাপমাত্রা যেন প্রাক-শিল্পযুগের তুলনায় ১.৫-২ ডিগ্রি সেলসিয়াস বাড়তে না পারে এবং বেশি কার্বন নিঃসরণের ফলে উন্নয়নশীল/স্বল্পোন্নত দেশগুলো যে মাত্রার ঝুঁকির মধ্যে পড়ছে, সেই অবস্থা থেকে উত্তরণে একটা সমোঝোতা হয়। ১৭৪ টি দেশ সেই সম্মেলন স্থলেই চুক্তিতে স্বাক্ষর করে কিন্তু অত্যন্ত দূঃখজনক হল, বিশ্বের মোড়ল দেশগুলোর মধ্যে এই চুক্তি বাস্তবায়নে বাধার প্রচেষ্টা দৃশ্যমান। ভূপৃষ্ঠের গড় তাপমাত্রা ১.৫ ডিগ্রি বেড়ে গেলে সমুদ্রপৃষ্ঠের যে উচ্চতা বৃদ্ধি পাবার সম্ভাবনা দেখা দিয়েছে তাতে দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় বিস্তৃর্ণ অঞ্চল সমুদ্রের নিচে তলিয়ে যাবে। ফলে এ অঞ্চলের মানুষকে এ ব্যাপারে ভাবতে হবে। ডিপ্লোমেটিক পলিটিক্সে জলবায়ু সম্পর্কে আরো জোড়ালো ভূমিকা না নিতে পারলে এই অঞ্চলের প্রত্যেকটি দেশের মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হবে,  জিডিপি কলাপস করবে।

 

জলবায়ু পরিবর্তন সংক্রান্ত বিভিন্ন গবেষণায় একথা উঠে এসেছে, ২০৫০ সালের মধ্যে এশিয়ায় বন্যা, খরাজলোচ্ছ্বাস, অতি বৃষ্টি, অসময়ে বৃষ্টিপাতসহ নানা প্রাকৃতিক অস্বাভাবিক অবস্থা বৃদ্ধি পাবে যা এই অঞ্চলের জিডিপির দুই-তৃতীয়াংশের ওপর প্রভাব ফেলতে পারে। ফোর্বস ম্যাগাজিনের রিপোর্ট অনুসারে, প্রতিবেশগত বিপর্যয়ে সবচেয়ে ক্ষতির মুখে পড়বে জলজ জীব। মৎস আহরণ কমে যেতে পারে প্রায় ৪০ শতাংশ যা দ্রুত বর্ধনশীল জনসংখ্যা অধ্যুষিত এশিয়ার জন্য ভয়াবহ ব্যাপার।

 

জনসংখ্যা বৃদ্ধি ও শিল্পায়নের কারণে এশিয়ার দেশগুলো বিশ্বে ক্রমেই গুরুত্ব বৃদ্ধি পাচ্ছে। বাংলাদেশ জলবায়ু সংক্রান্ত ডিপ্লোম্যাসিতে বিগত কিছু বছর ধরে গুরুত্ব আরোপ করে আসছে। এশিয়ার অস্তিত্ব সংকট মোকাবিলা করার জন্য এ অঞ্চলের প্রত্যেক দেশের এ ব্যাপারে নীতিগত সিদ্ধান্ত নেওয়া ও বৈশ্বিক রাজনীতিতে জলবায়ু সংকট মোকাবেলায় জোড়ালো ভূমিকা রাখা অত্যন্ত প্রয়োজনীয় হয়ে দাঁড়িয়েছে।

Photo by Nicholas Doherty on Unsplash

লেখকঃ আবদুল্লাহ আল মাহদী,

পরিবেশ বিষয়ক গবেষক।

Share:
.